Thursday, 10 September 2015

৪০ লক্ষ সাইকেল

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছেন, তাই রাজ্যের নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের মধ্যে ৪০ লক্ষ সাইকেল বিলি করবে রাজ্য সরকার। আগামী বিধানসভা ভোটের আগেই ওই ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে নতুন সাইকেল পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। কিন্তু এত ছাত্রছাত্রী আদৌ এ রাজ্যে ওই চারটি শ্রেণিতে পড়াশোনা করে কি না— তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে শিক্ষা দফতরে। বিকাশ ভবনের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, স্কুলের সঙ্গে মাদ্রাসার পড়ুয়া যোগ করেও সংখ্যাটা ৪০ লক্ষ হওয়া মুশকিল। সাইকেল বিলি শুরু হওয়ার আগেই তাই নয়ছয়ের অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। ভোটের মুখে সরকারি টাকায় খয়রাতির এই পরিকল্পনায় বিস্তর জল মেশানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রীর এই সাইকেল প্রকল্পের খরচ নিয়েও চিন্তিত নবান্নের কর্তারা। সরকারের হিসেব অনুযায়ী ৪০ লক্ষ সাইকেল কিনতে খরচ হবে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। কিন্তু ক’মাসের মধ্যে এত বাড়তি টাকা আসবে কোথা থেকে? নবান্নের খবর, এই প্রকল্পের জন্য শিক্ষা, সুন্দরবন, সংখ্যালঘু-তফসিলি জাতি-উপজাতি উন্নয়ন এবং পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর থেকে টাকা নেওয়া হবে। কিন্তু তাতে কুলোবে না বলে টাকা মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের অন্য কিছু দফতরকেও। বাজেট হওয়ার পরেও দফতরগুলি কী ভাবে টাকা দেবে— তা নিয়ে সংশয়ে অনেকেই। প্রশাসনের শীর্ষ মহলের এক কর্তার ব্যাখ্যা, ‘‘পরের বছরেই ভোট। এখন যা কিছু হবে, সবেরই লক্ষ হবে ভোটার-তোষণ। সাইকেল কেনার ঘোষণা করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। সুতরাং টাকা জোগাবে সরকার। এখানে কোন দফতর টাকা দেবে, তা বাজেটে ধরা আছে কি না— এ সব প্রশ্ন অবান্তর!’’ তাঁর ধারণা, এমন আরও অনেক ঘোষণা হবে, যার প্রতিটি ক্ষেত্রে একই প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু টাকা ঠিক জোগাড় হয়ে যাবে। গত মে মাসে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানায় ইন্দিরা ময়দানে সুন্দরবন গোল্ড কাপ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘আমরা ৪০ লক্ষ সাইকেল তৈরি করব। সরকারি বিদ্যালয়ের নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি ও সরকারি মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের তা বিতরণ করা হবে।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছা বলে কথা। তাই তা রূপায়ণে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন নবান্নের কর্তারা। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে তফসিলি জাতি ও উপজাতি উন্নয়ন নিগম সংশ্লিষ্ট দফতরের মাধ্যেমে দরপত্র আহ্বান করে। শর্ত দেওয়া হয়, শেষ তিন বছর সাইকেল তৈরির ব্যবসায় অন্তত ২০০ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন থাকতে হবে। আর আবেদনপত্রের সঙ্গে নমুনা হিসাবে কয়েক ধরনের সাইকেল জমা দিতে হবে। প্রথম পর্যায়ে ছাত্রদের জন্য ১০ লক্ষ ও ছাত্রীদের জন্য ১০ লক্ষ সাইকেল (মোট ২০ লক্ষ)-এর বরাত দেওয়া হয়। দেখা যায়, শর্ত পূরণ করতে না পারায় পশ্চিমবঙ্গের কোনও সাইকেল তৈরির সংস্থা দরপত্রে অংশই নিতে পারেনি। ফলে পঞ্জাবের লুধিয়ানার তিনটি কোম্পানি দরপত্রে একই দর দিয়ে বরাত পেয়ে যায়। অর্থ দফতরের এক কর্তা জানান, সাইকেল দাম ঠিক হয়েছে ছাত্রদের জন্য ৩২০০ ও ছাত্রীদের জন্য ৩১৯৫ টাকা। প্রথম পর্বে ২০ লক্ষ সাইকেল কেনা হবে। নবান্নের এক কর্তা জানান, তফসিলি জাতি-উপজাতি দফতরের কারিগরি কমিটি নমুনা হিসাবে পাঠানো সাইকেল পরীক্ষা করে দেখার পর বরাত দেওয়া হবে। এক মুখপাত্র জানান, মাস খানেক পরে আরও ২০ লক্ষ সাইকেলের দরপত্র চাওয়া হবে। প্রশ্ন হল, রাজ্যে সাধারণ স্কুল ও মাদ্রাসা মিলিয়ে ওই চার শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কত? শিক্ষা দফতরের খবর, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা জানতে স্কুলশিক্ষা দফতর, উচ্চশিক্ষা দফতর ও মাদ্রাসা পর্ষদের কাছ থেকে ছাত্রছাত্রীদের একটি হিসেব নেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি ও সরকারি সহায়তায় চলা স্কুলের নবম ও দশম শ্রেণিতে এখন প্রায় ২০ লক্ষ পড়ুয়া রয়েছে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে রয়েছে প্রায় ১৪ লক্ষ। পাশাপাশি, হাই মাদ্রাসা ও সিনিয়র মাদ্রাসা নিয়ে আরও দেড় লক্ষ ছেয়েমেয়ে রয়েছে। সব মিলিয়েও সংখ্যাটা কোনও মতেই ৩৬ লক্ষ অতিক্রম করছে না। বাকি ৪ লক্ষ সাইকেল কোথায় যাবে? সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রীই মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন’। রাজ্যের সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা বলেন, ‘‘সুন্দরবন এলাকায় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি এবং মাদ্রাসায় কত ছাত্রছাত্রী পড়ে, দফতরের কাছে তার হিসেব চেয়েছি। সেই মতো তালিকা প্রস্তুত করা হবে।’’ সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘‘দফতরের বাজেট থেকেই অর্থ দেওয়া হচ্ছে।’’ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কেপ্রশ্ন করার জন্য একাধিক বার ফোন করেও সাড়া পাওয়া য়ায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও জবাব মেলেনি। তবে অর্থ দফতরের এক কর্তার দাবি, এর পর সরকার সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ছেলেমেয়েদেরও সাইকেল দেওয়ার কথা ভাবছে। মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছাপূরণের এই প্রকল্প নিয়ে নয়ছয়ের অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। সিপিএম এবং বিজেপির দুই নেতার বক্তব্য, আগের চার লক্ষ, তার সঙ্গে নতুন ৪০ লক্ষ— সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে ৪৪ লক্ষ সাইকেল বিলি! এতে নিশ্চিত ভাবে জল মেশানো হয়েছে এবং হবে। কোথাও এক জন একাধিক সাইকেল পেয়ে যাবে। কোথাও আবার প্রকৃত প্রাপকেরা সাইকেল পাবেন না। তাঁদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সাইকেল-প্রকল্প নতুন একটা দুর্নীতির দরজা খুলে দেবে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘জনগণের টাকায় ভোট কিনতে নেমেছে সরকার।’’ কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান বলেন, ‘‘কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা রাজ্য নিজের মতো করে খরচ করছে।’’ রাজ্য বিজেপির সভাপতি রাহুল সিংহের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বুঝে গিয়েছেন, রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে সরকার ব্যর্থ। তাই সরকারি টাকায় ভোট নিশ্চিত করতে নেমেছেন।’’ শাসক দল অবশ্য অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। নবান্নের কর্তারা হিসাব করে দেখেছেন, এপ্রিল-মে মাসে ভোট হলে তার তিন মাস আগেই নির্বাচন বিধি কার্যকর হবে। সুতরাং ৪০ লক্ষ সাইকেল বিলি করতে হবে জানুয়ারির মধ্যেই। ‘‘কাজটা কঠিন হলেও যে ভাবেই হোক করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ বলে কথা!’’—মন্তব্য নবান্নের এক কর্তার।

No comments:

Post a Comment