Friday, 27 November 2015

আর্যরা বহিরাগত নয় 2

বর্তমানে ভারতে আর্য অনার্য নিয়ে ঝড় উঠছে, আমি ধারাবাহিক লেখায় প্রমাণ করে দেবো আর্যরা বহিরাগত নয়, এটা ইংরেজ দের ষড়যন্ত্র। দ্বিতীয় পর্ব ( লেখক শামসুজ্জোহা মানিক এর থেকে সংগৃহীত) বিশেষত ১৯২০-এর দশকে সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের পর থেকে ক্রমবর্ধমান প্রত্নতাত্ত্বিকআবিষ্কারসমূহ বহুকাল পূর্বে ব্রিটিশ এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের দ্বারা বহু প্রচারিত ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করলেও এখনও তারা যেমন এ কথা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয় যে আর্যরা মোটেই ভারতবর্ষে বহিরাগত বা হানাদার জনগোষ্ঠী নয়, বরং এখানকারই স্থানীয় অধিবাসী, যাদের কাছে আর্য একটি গুণবাচক শব্দ মাত্র, তেমন তাদের অন্ধ অনুসারী উপমহাদেশীয় পণ্ডিতরাও সে কথা স্বীকারের সৎ সাহস রাখেন না। সিন্ধু সভ্যতায় ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূতাত্ত্বিক, দেহতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি গবেষণার মাধ্যমে বেশ কিছু কাল যাবৎ প্রত্নতাত্ত্বিকপণ্ডিতরা মূলত একমত হয়েছেন যে, সিন্ধু সভ্যতার মূলভূমি যে অঞ্চলে অবস্থিত অর্থাৎ বর্তমান সমগ্র পাকিস্তান এবং বর্তমান ভারতের উত্তর-পশ্চিমের বিশাল অঞ্চলে প্রায় দশ হাজার বৎসর পূর্বে যে জনগোষ্ঠীসমূহ বসতি স্থাপন করে তাদের ধারাবাহিকতা প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত অব্যাহত থেকেছে। অর্থাৎ এই সুদীর্ঘ কালপর্বে এই বিশাল অঞ্চলে কোন ধরনের উল্লেখযোগ্য বহিরাগমন বা বহিরাক্রমণ ঘটে নাই। অথচ ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মতে খ্রীষ্টপূর্ব ১২ শত থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫ শতকের মধ্যে কোন এক সময় ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণ ও আবাসন ঘটে। এভাবে প্রত্নতত্ত্বের বিচারে ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণতত্ত্ব সম্পূর্ণ রূপে বাতিল হয়ে যায়। এমন অবস্থায় ভারতবর্ষের ইতিহাস ও সমাজ বিকাশের ব্যাখ্যায় দেখা দেয় শূন্যতা। এ শূন্যতা পূরণে এতকাল ইউরোপীয় ভ্রান্ত ইতিহাস ব্যাখ্যার জের টেনে গোঁজামিল দেওয়া হচ্ছিল। এই অবস্থায় আমি ঋগ্বেদের উপর অধ্যয়নের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে এটি কোন আক্রমণকারী পশুপালক ও যাযাবর জনগোষ্ঠীর গ্রন্থ নয়, বরং এটি সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের একাংশ দ্বারা সংগঠিত একটি ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সময় রচিত মন্ত্রসমূহের সমন্বয়ে গঠিত ধর্মগ্রন্থ। এই ধারণার ভিত্তিতে এবং মহাভারত ও প্রাচীন পার্সীদের ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাসহ প্রাচীন আরও কিছু গ্রন্থ অধ্যয়নের পর ১৯৯০ সালে আমি ‘ভারত ইতিহাসের সূত্র সন্ধান’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করি। তবে এটি অপ্রকাশিত রয়ে যায়। পরে আমার সঙ্গে নূতন উপলব্ধি ভিত্তিক অনুসন্ধানে পণ্ডিত ও গবেষক শামসুল আলম চঞ্চল যোগ দেন। আমরা উভয়ে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিকতথ্যসমূহের উপর ব্যাপক অধ্যয়ন করি এবং তার ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে ঋগ্বেদ এবং আর্যদের সম্পর্কের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত অধিকতর দৃঢ়বদ্ধ হয়। আমরা উভয়ে সিন্ধু সভ্যতা ও আর্যদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রত্নতত্ত্ববিদও ঐতিহাসিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। ১৯৯৪ সালে শামসুল আলম চঞ্চল আমার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে The Indus Civilization and the Aryans নামে একটি প্রবন্ধ তৈরী করে সিন্ধু সভ্যতার বিষয়ে বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রত্নতত্ত্ববিদএবং পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি-এরপ্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত ডঃ রফিক মুগলের নিকট পাঠান। রফিক মুগল এই প্রবন্ধকে একটি সফল প্রয়াস হিসাবে উল্লেখ করে এটিকে যথাশীঘ্র প্রকাশের জন্য তাগিদ দিয়ে উত্তর দেন। এর পর আমরা উভয়ে ১৯৯৫ সালে The Aryans and the Indus Civilization নামে একটি ইংরাজী বই এবং ২০০৩ সালে ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’ নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করি। এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা উচিত যে, আর্যরা যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসী আমাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের কিছু সংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিকএবং বেদ পণ্ডিতও তাদের মতৈক্যের কথা জানান। যেমন ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ও প্রত্নত্ত্ববিদ ডঃ আর, এস, বিশ্‌ট্‌, সিন্ধু সভ্যতার উপর ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদডঃ এস, আর, রাও এবং ভারতের বিখ্যাত বেদ পণ্ডিত ডঃ ভগবান সিং, ইত্যাদি।

No comments:

Post a Comment