রাজা বল্লাল সেনের কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন ও মানব সমাজকে জলন্ত চিতায় শেষ করার পর রঘুনন্দন মানব সমাজকে ছাইয়ে পরিণত করেন।
.
বল্লাল সেন সমাজকে ধ্বংস করেন এবং রঘুনন্দন সমাজ ও নারী জাতিকে সমূলে বিনাশ করেন। নবদ্বীপে ভগ্ন কুলীন ব্রাহ্মণের ষরে রঘুনন্দন ভট্রাচার্য জন্ম গ্রহণ করেন। সমাজ রক্ষার অজুহাতে তিনি 'অষ্টাবিংশতিত্ত্ব স্মৃতি' লিখেছেন। বল্লাল সেনের কৌলিণ্য প্রথায় সমাজের রক্তমাংস ধ্বংস হয়েছিল এবং রঘুনন্দন সমাজের উপর অত্যাচার শরু করলেন।
.
ব্রাহ্মণদের প্রধান্য বিস্তার করার জন্য তিনি ঘোষণা করলেন- ''যুগে জঘন্যে দ্বিজাতি ব্রাহ্মণ শূদ্র এবহি"
.
#অর্থাৎ- কলিযুগে মাত্র দুটি জাতি আছে একটি ব্রাহ্মণ ও অপরটি শূদ্র।
.
রঘুনন্দন শাণিত লেখার দ্বার হিন্দু সমাজের ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সমাজকে বিলুপ্ত করলেন নব্যস্মৃতি আদেশ বলে।
.
এভাবে রঘুনন্দনই প্রথম বর্ণাশ্রম প্রথা ধ্বংস করলেন। তার লেখনিতে বৈদ্য, কায়স্হ, নবশাখ, পাল, সাহা, কুন্ডু, নামিত সহ সকল শ্রেণীর হিন্দু মানুষ বল্লাল সেনের গড়া জাত বিভাগে সবাই শূদ্র শ্রেণীতে ঘোষিত হলো।
.
দেশ হতে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য শক্তি ধ্বংস হল।
রঘুনন্দন ব্রাহ্মণ সমাজ যাতে সহজে শূদ্রদের শোষণ করতে পারে তার লেখনীর মাধ্যমে নানাবিধ ব্যবস্থা করলেন। ব্রাহ্মণ সমাজ রঘুনন্দনের উইল লাভ করে শূদ্র জাতিকে শোষণের জন্য তৎপর হয়ে উঠলো।
.
জলন্ত আগুনে জল দিলে আগুন নিভে যায়, কিন্ত লোভী ব্রাহ্মণের সেবায অর্থ, নৈবেদ্য, সব দিলেও সেই ক্ষুধার আগুন সহজে নিভে যায় না।
.
রাজাকে খাজনা প্রদান প্রজাদের মৃত্যুর সাথে শেষ হয়, কিন্ত ব্রাহ্মণের খাজনা জন্মের পূর্ব হতে মৃত্যুর পরেও বংশ পরস্পায় আদায় হতে থাকে। বিবাহ, পঞ্চামৃত, সাধভক্ষণ, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চুড়াকরণ, পুকুরখনন, গৃহে প্রবেশ, বিদেশযাত্রা, পূজা, পার্বন, তিথি, নক্ষত্র দোষ প্রভৃতি কাজে ব্রাহ্মণের খাজনা চাই শূদ্রের কাছ থেকে।
.
মৃত যজমান শ্মশানে চলেছে সেখানেও ব্রাহ্মণের খাজনা আদায়। যজমান মৃত মাতা-পিতার বা পুত্র কন্যার শোকে পাগল, ব্রাহ্মণ চৌদ্দ পুরুষের পিন্ড দানের ফর্দ্দ করে শোকাতুর যজমানের শোকের অবসরে যজমানকে লুণ্ঠন ও শোষণ করে।
.
শূদ্র বিশ্বাস করতে শেখে ব্রাহ্মণের হাতেই মৃত ব্যক্তির স্বর্গ ও নরক। ব্রাহ্মণের নিকট মাথা নত করে প্রায়শ্চিত্ত করলেই সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
.
কোন ব্রাহ্মণ যখন দেখতে পান কোন মানুষ মৃত্যুপথের যাত্রী তখন তার আত্মীয় স্বজনকে পাপের ভয় দেখিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান দেন. আমষষ্ঠী, ঝিঙ্গাষষ্ঠী, মুলাষষ্ঠী, তালনবমী, অশোকাষ্টমী, দুর্ব্বষ্টমী, জামাই ষষ্টী ও ভাতৃদ্বিতীয়ার গুণ ও মহিমা প্রচার করে ব্রাহ্মণগণ ধনী-গরীব সকলেরই সমান ভাবে শোষণ করতে শুরু করলেন।
.
শহরে শহরে জালিয়াতির মাধ্যমে তীর্থস্হান রচনা করে পূণ্যের হাট বসিয়ে ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত খুব সস্তায় পূণ্য বিক্রি শুরু করলেন।
.
কোটি কোটি নর-নারী সারা জীবন পাপ করে ব্রাহ্মণদের অর্থ সম্পদ দান করে পূণ্যের লোভে তীর্থে ঘোরা শুরু করলেন। সমাজের অসংখ্য নর-নারী কেহ কৃষক রূপে, কেহ দুলে বেহারারূপে, সূত্রধররূপে, চর্ণকার রূপে, কেহ নাপিত রূপে, কেহ ধোপা রূপে, কেহ কর্মকার রূপে আবার কেহ ব্যবসা করে জীবন ও সংসার নির্বাহ করেন।
.
এসব ব্যবসায়ে মূলধনের প্রয়োজন আছে।
কিন্ত ব্রাহ্মণ বা পুরোহিতের ব্যবসায়ের কোন মূলধনের দরকার নেই। তাই তিনি পরকালের জন্য শ্রাদ্ধের পিন্ডি চটকানো, মুক্তিদান, উদ্ধার, করা প্রভৃতি বিনা মূলধনের ব্যবসা করেন। এই ব্যবসায় কোন সাক্ষ্য, দলিল বা প্রমাণের প্রয়োজন নেই।
.
রঘুনন্দন এবার তার ভেদনীতি আরও বিস্তার করেন।
বৈদ্য, কয়স্ত, নবশাখ হতে ডোম, মেথর পর্যন্ত, সকলকেই তিনি ব্রাহ্মণের দাস, শূদ্র বা গোলাম বলে ঘোষণা করলেন।
.
তার পর তিনি শূদ্রদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে সৎ বা অসৎ শূদ্র বলে ঘোষণা করলেন। যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া।
. সৎ শূদ্র কথার অর্থ ভাল চাকর। রঘুনন্দনের প্রদত্ত উপাধী কোন কোন শূদ্র খুব গর্বে গ্রহণ করেলেন।
.
তিনি ভাবতে লাগলেন আমি অন্য শূদ্রদের থেকে একটু ভাল কারণ আমি কুলীন শূদ্র। ব্রাহ্মণদের পদাঘাত নিরবে হজম করে শত শত শূদ্রগোষ্ঠী বা গোলামগোষ্ঠী অন্য শূদ্র বা গোলামদের উপর অত্যাচার শুরু করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করলো না।
.
তারা ভুলে গেল যে আমরা সকলেই শূদ্রশ্রেণী তথাকথিত ব্রাহ্মণদের চোখে।
.
বিবাহ, শ্রাদ্ধ, পূজা, পার্বন, ও সামাজিক অনুষ্ঠানে শূদ্রদের বাসার আসন ব্রাহ্মণদের আসন থেকে সর্বদা পৃথক হয়। ব্রাহ্মণদের হুঁকায় শূদ্র শ্রেণীর মানুষ তামাক পান করতে পারবে না।
.
শূদ্রের সামনে দেবতাকে ভোগ দেওয়া যাবে না।
ব্রাহ্মণদের বাড়িতে যদি কোন শূদ্র খাবার গ্রহণ করে তবে নেই শূদ্রকে এঁটো পরিষ্কার করতে হবে। শূদ্রের সৎকারে যদি কোন ব্রাহ্মণ অংশ গ্রহণ করে তবে তার ব্রহ্মত্ব নষ্ট হবে। শ্মশানে শূদ্রের চিতা ভস্মের নিকট ব্রাহ্মণের শবদাহ চলবে না, শূদ্রের বেদে ও গায়ত্রী মন্ত্রে অধিকার নেই। শূদ্র ওম স্বধা বা স্বাহা প্রভৃতি বেদমন্ত্র উচ্চারণ করবে না।
.
শূদ্র ওম স্থলে পৌরাণিক মন্ত্র নমো নমঃ বলবে।
ব্রাহ্মণ শূদ্রের বাড়ীর কোন দেবতাকে মাথা ঠেকিয়ে প্রনাম করবে না কারণ শূদ্রের বাড়ীর দেব-দেবী শূদ্র।
শূদ্রের বাড়ীর পূজার ভোগ শূদ্রান্ন তাই কোনক্রমেই এই খাবার গ্রহণ করা যাবে না। শূদ্রের খাবার গ্রহণ করলে পাড় হয়।
.
যদি কোন শূদ্র বিগ্রহ বা প্রতিমাকে স্পর্শ করে তবে বিগ্রহের জাতিপাত হয়। বিগ্রহকে গোবর চোনা ও পঞ্চগোব্য খাইয়ে শুদ্ধ করতে হয়। কোন ব্রাহ্মণ বা পুরোহিতের শালগ্রাম শিলা যদি কোন শূদ্রের বাড়ীতে যায় তবে সেই বিগ্রহকে প্রায়শ্চিত্ত করে ঘরে তুলতে হবে।
.
শূদ্র প্রদত্ত ব্রত, ভিক্ষা দান, খাদ্যদ্রব্য বা জলদান ব্রাহ্মণের নিকট অগ্রাহ্য। যে সব ব্রাহ্মণেরা শূদ্রদের ঘৃণার চোখে দেখেন তারা সকলেই সৎ ব্রাহ্মণ আর যারা শূদ্রের প্রতি দয়া দেখান তারা অসৎ ব্রাহ্মণ।
.
শূদ্রের বা শূদ্রজাতি প্রদত্ত জল সৎ ব্রাহ্মণের সন্ধ্যা আহিক ওক পূজায় অব্যবহার্য।
.
#রঘুনন্দনব্রাহ্মণ শ্রেণি ও শূদ্রদের মধ্যে এই ভেদনীতির মহাপ্রচীর তৈরী করে গেলেন।
.
#ধ্বংসহল সনাতন ধর্ম ও পবিত্র মানব সমাজ ব্যবস্থা।
#লিখেছেন_রহিত_রয়
No comments:
Post a Comment