আগেই জানিয়েছিলাম ব্রিটিশ শাসনের আমলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পৃষ্ঠভূমি ছিল পশ্চিমবাংলা।এমনিই এক বীর দেশপ্রেমী ছিলেন ক্ষুদিরাম বসু।
জীবন:-------ক্ষুদিরাম বসু ডিসেম্বর ১৮৮৯ ভারতের পশ্চিম বঙ্গের অন্তর্গত মেদিনীপুর জেলার মৌরনি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলোক্য নাথ বসু । তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী। তিনি তার পুত্রকে তার বড় বোনের কাছে(অর্থাৎ ক্ষুদিরামের মাসি)মানুষ করতে পাঠান। ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তিতে তার বড় বোনের কাছেই বড় হন।
●● শিক্ষা জীবন:----------ক্ষুদিরাম বসুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় তমলুকের হ্যামিলটন স্কুলে। ১৯০২ সালে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অমৃতর সাথে তামলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। সেখানে তিনি মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্যলাভ করেন এবং এই শিক্ষকের সংস্পর্শে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হন। ক্ষুদিরাম বসু তার শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নিকট হতে এবং শ্রীমদ্ভগবদগীতাপড়ে দেশকে ভালোবেসে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে অনুপ্রাণিত হন।
বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড:--------------------ক্ষুদিরাম বসু তার প্রাপ্তবয়সে পৌঁছানোর অনেক আগেই একজন ডানপিটে, রোমাঞ্চপ্রিয় হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯০২-০৩ সালে যখন বিপ্লবী নেতা শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী দলগুলোর সাথে গোপন পরিকল্পনা করেন, তখন তরুণ ছাত্র ক্ষুদিরাম বিপ্লবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হন। এখানেই তার বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। ১৯০২ সালেই তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত দলে যুগান্তরে যোগদান করেন। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ এবং দলের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন। সেইসময়ে তিনি বিলাতি দ্রব্য বয়কট, বিলাতি লবণের নৌকা ডোবানো প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৬ সালে মেদিনীপুরের এক প্রদর্শনীতে বিপ্লবী পত্রিকা ‘সোনার বাংলা’ বিলি করার সময়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েও পুলিশকে মেরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই অভিযোগে পরে আবার গ্রেফতার হন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু বয়স নিতান্তই অল্প বলে সরকার কর্তৃক মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যায়। বিপ্লবীদের গোপন সংস্থায় অর্থের প্রয়োজনে ১৯০৭-এ মেলব্যাগ লুটে অংশ নেন।আলিপুর আদালত প্রাঙ্গনে বন্দেমাতরম ধ্বনি উচ্চারণ করার অপরাধে কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সুশীল সেন নামক ১৬ বছরের এক কিশোরকে প্রকাশ্য স্থানে বেত মারার আদেশ দেন। এই শাস্তির বদলা নিতে ও সেই সময় বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দমনমূলক কার্যকলাপের জন্য যুগান্তর দল কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিমধ্যে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে নিরাপত্তার কারণে কিংসফোর্ডকে বিহারের মজফফরপুরে বদলি করা হয়। সেখানে তাকে হত্যার দায়িত্ব পড়ে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর ওপর। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাত ৮টার সময় ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী রাতের অন্ধকারে কিংসফোর্ডের গাড়ি ভেবে ভুল করে ঘোড়ারগাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করে নিরপরাধ কেনেডি সাহেবের স্ত্রী মিসেস কেনেডি ও তার কন্যাকে হত্যা করেন। অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ক্ষুদিরাম বসু হত্যাকান্ডের স্থল থেকে ২৫ মাইল দূরে ওয়েইনি স্টেশনে পরদিন ধরা পড়েন। অপর বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকেও ধরার চেষ্টা হলে তিনি নিজের রিভলবারের গুলিতে আত্মঘাতী হন। কয়েক মাস বিচারের পর তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। ফাঁসির আদেশ শুনে ক্ষুদিরাম বসু হাসিমুখে বলেন যে, মৃত্যুতে তাঁর কিছুমাত্র ভয় নাই। মজফফরপুর জেলেই ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর,
৭ মাস ১১ দিন। কথিত আছে, হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান অগ্নিযুগের প্রথম শহিদ ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর নির্ভীক দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ বাংলার যুবসমাজকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
■■তার সম্পর্কে সেরা উক্তি------------ ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে অগ্নিযুগের আরেক বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো লিখেছেন যে তাঁর দুঃসাধ্য কাজ ক্রবার সহজ প্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রবল ছিল। তিনি আরো লিখেছেন, “ক্ষুদিরাম মহাপুরুষ ছিল না অথবা মানব আকারে শাপভ্রষ্ট দেবতাও ছিল না। সে ছিল বাঙলার হাজার হাজার ছেলের মতোই একটা ছেলে। তারও দোষ ছিল অনেক; আর সে যে স্বনামধন্য হয়েছে, আমরা এখানে তার সেই শহীদপনার (Martyrdom) কথাও ধরছি না। আমরা দেখছি তার অন্যায় অত্যাচারের প্রতি তীব্র অনুভূতি। সে অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় নয় বৃথা আস্ফালনে নয়; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
পীতাম্বর দাসের গান:------------------ ক্ষুদিরামের ফাঁসি গানটি নিশ্চয়ই শুনেছেন? ক্ষুদিরামের আত্মদান নিয়ে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস রচনা করেন অমর গণসংগীত ‘একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি।’ সরল লৌকিক ঝুমুর বাউল সুরে গীত গানটি তখন সারা বাংলায় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বজনগ্রাহ্যতালাভ করে।
গান-------------------------------
গানের কথা একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।
কলের বোমা তৈরি করে
দাঁড়িয়ে ছিলেম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংলন্ডবাসী।
হাতে যদি থাকতো ছোরা
তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা মাগো
রক্ত-মাংসে এক করিতাম
দেখতো জগতবাসী
শনিবার বেলা দশটার পরে
জজকোর্টেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের
ফাঁসি
বারো লক্ষ তেত্রিশ কোটি
রইলো মা তোর বেটা বেটি মাগো
তাদের নিয়ে ঘর করিস মা
ওদের করিস দাসী
দশ মাস দশদিন পরে
জন্ম নেব মাসির ঘরে
মাগো তখন যদি না চিনতে পারিস
দেখবি গলায় ফাঁসি।
ॐ卐সত্যমেব জয়তেॐ卐 বীরশ্রেষ্ঠ লহ প্রণাম
No comments:
Post a Comment