ঋগ্বেদ (সংস্কৃত: ऋग्वेद ṛgveda, ঋক্ (ṛc, "স্তুতি, কাব্য"[১]) ও বেদ (veda "জ্ঞান")) হল একটি প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃত স্তোত্র সংকলন।[২] এটি বেদ নামে পরিচিত হিন্দুধর্মের চারটি আনুশাসনিক ধর্মগ্রন্থের (শ্রুতি) অন্যতম।[note ১]
এটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় রচিত প্রাচীনতম বিদ্যমান গ্রন্থগুলির একটি।[৩]ভাষাবৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণিত হয় যে, ঋগ্বেদ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১২০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে রচিত হয়েছিল।[৪][৫][৬] যদিও অনেকে মনে করেন, এই গ্রন্থের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০-১১০০ অব্দ।[৭][৮][note ২]
ঋগ্বেদের কয়েকটি পৌরাণিক কাহিনি এবং বিশ্বের উৎপত্তি, দেবদেবীর স্তোত্র, জীবন, সম্পত্তি ইত্যাদি লাভের জন্য প্রাচীন প্রার্থনামূলক অনেক কাব্যিক উপাখ্যান রয়েছে।[১১] এগুলির কয়েকটি আজও হিন্দুদের বিভিন্ন উৎসবে অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা হয়। ঋগ্বেদ পৃথিবীর সেই প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থগুলিরএকটি যা আজও মান্যতা পায়।[১২]
পাঠ
ঋগ্বেদের যে পাঠটি আজ পাওয়া যায় সেটির মূল ভিত্তি লৌহযুগের (নিচে কালনির্ধারণ দেখুন) একটি সংকলন। এই সংকলনটি থেকে ‘গোত্রীয় গ্রন্থাবলি’ ((মন্ত্রদ্রষ্টা, দেবতা ও ছন্দ অনুসারে ২য়-৭ম মণ্ডল[১৩]) পরবর্তীকালে সম্পাদিত একটি সংস্করণ পাওয়া যায়। এই পরবর্তীকালীন সংকলনটি আবার অন্যান্য বেদসমূহের সঙ্গে মুখে মুখে সম্পাদিত একটি সংকলন। এই সংকলনে পরবর্তীকালে কিছু প্রক্ষিপ্ত বিষয় যুক্ত হয়েছিল, যা মূল ঋগ্বেদের কঠোর বিন্যাস-প্রণালীর সঙ্গে বেমানান। এর সঙ্গে বৈদিক সংস্কৃতের বিশুদ্ধ উচ্চারণ পদ্ধতির মধ্যেও কিছু পরিবর্তন (যেমন সন্ধির নিয়ামন[১৪]) এসেছিল।
অন্যান্য বেদসমূহের মতো সম্পাদিত পাঠটির একাধিক সংস্করণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে পদপাঠ সংস্করণটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি পৌস আকারে রচিত এবং মুখস্ত করার সুবিধার্থে প্রতিটি শব্দ এখানে পৃথক আকারে লিখিত। এছাড়া সংহিতাপাঠও গুরুত্বপূর্ণ। এটি সন্ধির নিয়মানুসারে লিখিত (প্রতিসখ্য বিধানে বর্ণিত নিয়মানুসারে)। এটি হল আবৃত্তি-উপযোগী মুখস্ত রাখার সংস্করণ।
পদপাঠ ও সংহিতাপাঠ বিশ্বাসযোগ্যতা ও অর্থগতদিক থেকে ঋগ্বেদের মূল পাঠের সবচেয়ে নিকটবর্তী।[১৫] প্রায় এক হাজার বছর ধরে ঋগ্বেদের মূল পাঠ সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে মুখে মুখে সংরক্ষিত হয়েছিল।[১৬] এটি করার জন্য মুখে মুখে প্রচলিত রাখার প্রথাটিকে একটি বিশেষ উচ্চারণভঙ্গি দেওয়া হয়েছিল। এর জন্য সংস্কৃত সমাসবদ্ধ শব্দগুলির ব্যাসবাক্য এবং বৈচিত্র্য দান করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও ব্যাকরণগত পরিবর্তনও আনা হয়েছিল। শব্দের এই পরিমার্জনার সঙ্গে সঙ্গেই অঙ্গসংস্থানবিদ্যা ও ধ্বনিবিজ্ঞানের একটি সমৃদ্ধ প্রথা গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত গুপ্তযুগের (খ্রিস্টীয় ৪র্থ-৬ষ্ঠ শতাব্দী) আগে ঋগ্বেদ লিখিত হয়নি। গুপ্তযুগে ব্রাহ্মী লিপি সুপ্রচলিত হয়েছিল (ঋগ্বেদের প্রাচীনতম বিদ্যমান পাণ্ডুলিপিগুলি পরবর্তী মধ্যযুগের)।[১৭]যদিও মুখে মুখে প্রচলিত রাখার প্রথাটি আজও আছে।
ঋগ্বেদের আদি পাঠ (যেটি ঋষিগণ অনুমোদন করেছেন) বিদ্যমান সংহিতাপাঠের পাঠের সঙ্গে কাছাকাছি গেলেও সম্পূর্ণ এক নয়। তবে ছন্দ ও অন্যান্য দিক থেকে এর কিছু অংশ অন্তত একই ধাঁচে লেখা।[১৮]
No comments:
Post a Comment