সময় টা অষ্টাদশ দশক, আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু মোগল সাম্রাজ্য ক্ষয়িষ্ণু প্রায়। ছত্রপতি শম্ভুজি মহারাজের মৃত্যুর পর মারাঠারা মোগল সাম্রাজ্য গোড়া থেকে উপরে ফেলতে বদ্ধপরিকর। সাম্রাজ্য রক্ষা করার তাগিদে মোগল সাম্রাট হায়দ্রাবাদের নিজাম আশিফ ঝাঁ কে দায়ীত্ব দেন মারাঠা দের জ্বব্দ করতে এবং সাথে দেন এক লক্ষের অধিক বিশাল মোগল সেনা ও ভারী গোলান্দাজ বাহিনী। এদিকে মারাঠা সাম্রাজ্যে মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিবাদ তখন তুঙ্গে কারন ছত্রপতি শিবাজীর প্রপুত্র সাহু ছত্রপতি হিসাবে সিংহাসনে বসলেও তার অপর ভাই দ্বিতীয় শম্ভুজী এই পদের দাবীদার। নিজাম এই সমীকরণ টি ভালই বুঝতেন তাই ১৭২৬ সালে বিশাল মোগল সেনা নিয়ে তিনি দিল্লী থেকে মারাঠাদের রাজধানী সাতারার দিকে অগ্রসর হন ও গোপনে দ্বিতীয় শম্ভুজীর কে ছত্রপতি হিসাবে তার সমর্থন রয়েছে বার্তা পাঠান। এর ফল হয় মারাত্মক কিছু পদলোভী মারাঠা সেনাপ্রধান কে নিয়ে শম্ভুজী বিদ্রোহ করে এবং নিজামের নেতৃত্বাধীন মোগল সেনাকে সাতারায় প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ছত্রপতি সাহু তার পরিবার ও বিশ্বস্ত মারাঠা সেনা নিয়ে দক্ষিন পুনের পুরন্দর দূর্গে আশ্রয় গ্রহন করেন কিন্তু নিজাম তার বিশাল সেনা নিয়ে দূর্গ অবরোধ করে দেয়। ছত্রপতি তার পেশোয়া শ্রীমন্ত বাজীরাও বল্লাল বালাজী ভট কে আদেশ পাঠান রাজধানী রক্ষা করার জন্য।
.
ঘটনা ::
.
বাজীরাও তখন খান্দেশে তার সেনা নিয়ে অবস্থান করছিলেন। অসাধারণ বুদ্ধিমান এই মারাঠা পেশোয়া ছত্রপতির আদেশ মত রাজধানী তে ফিরে মোগল সেনার সাথে যুদ্ধ করার বদলে তার সেনা নিয়ে পশ্চিমে গুজরাটের দিকে যাত্রা করে ও সহজেই গুজরাট দখল করে নেয় এবং গুজরাটের মোগল নিযুক্ত শাসকের সাথে চুক্তি করে যুদ্ধে তার সেনাকে লজিস্টিকস সাপোর্ট দেওয়ার জন্য বাধ্য করান। এরপরে বাজীরাও খুব দ্রুত নিজামের অধিকারকৃত মালওয়ার দিকে অগ্রসর হন ও মালওয়ার দখল করে নেন। এরফলে দিল্লী থেকে নিজামের নেতৃত্বাধীন সেনার জন্য সমস্ত লজিস্টিকস সাপ্লাই কেটে যায়।
.
এবার বাজীরাও তার সেনা বাহিনী নিয়ে অরঙ্গাবাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই খবর শুনেই নিজাম অস্থির হয়ে ওঠেন কারন আওরঙ্গাবাদ ছিল নিজামের তৎকালীন রাজধানী ও খুবই সমৃদ্ধ শহর। ছত্রপতি সাহু কে ধরার আশা ত্যাগ করে ও পুরন্দার দুর্গ থেকে অবরোধ তুলে নিজাম তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাজিরাও এর পিছনে পিছনে অরক্ষিত আওরঙ্গাবাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বাজিরাও এর পরিকল্পনা সফল হয় কারন এটাই ছিল তার পরিকল্পনা যে "শত্রুর পিছনে না দৌড়ে শক্র যেন তোমার পিছনে দৌড়ায় তার ব্যবস্থা করা।" বাজিরাও কাল বিলম্ব না করে অপর দুই মারাঠা সেনাপতি মাল্লাল রাও হোলকার ও রানাজী সিন্ধে কে তাদের সেনাবাহিনী নিয়ে নিজামের সেনাবাহিনীর পিছন পিছন ধীরে ধীরে ওরাঙ্গাবাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য আদেশ দেন ফলে নিজামের অজান্তেই নিজাম বাজিরাও এর পাতা ফাঁদে পা দেন।
.
বাজিরাও এর সেনাবাহিনী ছিল ছোট এবং অশ্বারোহী বাহিনী প্রধান কিন্তু নিজামের সেনা ছিল সংখ্যায় বিপুল ফলে বাজিরাও গতি ছিল বেশি। তাই অনেক আগেই বাজিরাও ওরাঙ্গাবাজের নিকটে গোদাবরী নদীর তীরে পৌছে গেলেও নদী অতিক্রম করে ওরাঙ্গাবাদ আত্রুমন না করে গোদাবরী নদীর তীরে ওরাঙ্গাবাদ থেকে ২০কিমি দূরে পালকিথ তে অবস্থান করে। নিজাম সেনা নিয়ে গোদাবরী অতিক্রম করে কিন্তু যখন জানতে পারেন যে, বাজিরাও ২০কিমি দূরে অবস্থান করছেন তখন আবার গোদাবরী নদী পেরিয়ে বাজিরাও কে তাড়া করেন। তবে তীব্র গরম ও লজিস্টিক সাপ্লাই না পাওয়ায় নিজামের সেনারা এমনি তেই ক্লান্ত ছিল তাই দ্রুত সেনার চলাচলের জন্য নিজাম তার শক্তিশালী গোলান্দাজ বাহিনী গোদাবরীর অন্য পাড়ে রেখেই পাল্কিথের দিকে অগ্রসর হন। মার্চ, ১৭২৮ তে দুইপক্ষ মুখোমুখি হয়। বাজিরাও এর ছোট সেনাবাহিনী দেখে নিজাম যুদ্ধ শুরু করলেও কিছুক্ষণ পরেই তার ভুল ভাঙ্গে যখন তিনি বুঝতে পারেন যে তার অলক্ষেই অপর একটি মারাঠা সেনাদল তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তীব্র জল কস্টে এমনিই নিজামের সেনা কান্ত ছিল তার ওপর সাঁড়াশি আত্রুমনে নাজেহাল হয়ে পড়ে। নিজামের মোগল সেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় ও নিজাম বাধ্য হয়ে মারাঠা দের সাথে সন্ধিচুক্তি করে।
.
ফলাফল ::
.
সন্ধিচুক্তি অনুসারে, পেশোয়া বাজিরাও নিজাম কে বাধ্য করেন ছত্রপতি সাহু কে ছত্রপতি হিসাবে মেনে নিতে এবং সমগ্র দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের কর ব্যবস্থাও মারাঠা দের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে এবং ভবিষ্যতে বাজিরাও এর দিল্লী অধিযানের সময় নিজাম নিরপেক্ষ ভুমিকায় থাকবে এই আশ্বাসও বাজিরাও আদায় করে নেন। এই চুক্তির ফলে ভারতবর্ষের বৃহদ অংশ মোগল দের নিয়ন্ত্রণ থেকে একেবারে বেড়িয়ে যায়।
.
বি: দ্রি: = ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ফিন্ডমার্শাল Bernard "Monty" Montgomery পেশোয়া বাজিরাও এর এই যুদ্ধনীতি অনুসরণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিশর ফ্রন্টে নাতসি বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্রশক্তি কে জয় এনে দেয় এবং পরবর্তী কালে নিজের লেখা যুদ্ধনীতি নিয়ে বই তে এই যুদ্ধকে "A masterpiece of strategic mobility" বলে আখায়িত করেছিলেন।

No comments:
Post a Comment