ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে গুটিকয়েক বাংলাদেশী হিন্দুর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তাদের ধারণা ছিল, মোদি অবতারের মত এসে সকলকে উদ্ধার করবেন! মোদি কেন বাংলাদেশে চলমান হিন্দু নির্যাতনের বিষয়ে কথা বলতে যাবেন? যেখানে বামপন্থী লীগপন্থী হিন্দুরা স্বয়ং বলে থাকে তারা সুখে আছে, শান্তিতে আছে, নিরাপদে আছে, সেখানে বাইরের দেশের কি করণীয় থাকতে পারে? তিনি যদি তাঁর বক্তব্যে হিন্দু নির্যাতনের প্রসঙ্গ টানতেন তবে কদাচিৎ শতকরা ৮০ শতাংশ হিন্দু রাজনীতির স্বার্থে মোদিকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দিত যেমনটা 'মূখ্যমন্ত্রী' মোদিকে বলা হত।
২০১৩ থেকে আজ অবধি এই দুই বছরে লীগের শাসনকালে কত হাজার মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে, কত লক্ষ হিন্দু তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে দেশ ছেড়েছে কেউ হিসাব দিতে পারবে? বিনিময়ে কতটুকু আন্দোলন সংগ্রাম করেছে বাংলাদেশী হিন্দুরা? হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, পূজা উদযাপন পরিষদ সহ ইসকন, রামকৃষ্ণ মিশন, সৎসঙ্গ থেকে শুরু করে বারদী আশ্রমের সাধু পুরুষগণ কেউ কি এসবের নূন্যতম প্রতিবাদ জানিয়েছে? প্রেসক্লাবের সামনে দশ কুড়িজনের মানববন্ধনে কি আর জমাটবদ্ধ বিশ্ব বিবেক কে নাড়া দেওয়া যায়!
নরেন্দ্র মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি বাংলাদেশ সফরে মন্দির পরিদর্শন করলেন। মোদি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মায়ের পূজা দিয়েছেন, আরতি করেছেন, তারপর ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শন করেছেন। শুনেছি, মোদি মিশনের মহারাজকে বাংলাদেশী হিন্দু কমিউনিটির কথা জিজ্ঞাসা করলে মহারাজ জানিয়েছেন সকলে কুশলেই আছেন! আরো শুনেছি, ঢাকেশ্বরী মন্দির ও মিশন থেকে মোদিকে অনেক মূল্যবান উপহারও দেওয়া হয়েছে, সেখানে ঐক্য পরিষদের সভাপতিও উপস্থিত ছিলেন, উপহারের পাশাপাশি তিনি কি মোদির হাতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে একটি অভিযোগ পত্র তুলে দিতে পারতেন না?
আমি বিশ্বাস করি, আজ যদি বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকত তবে হিন্দুরা এভাবে নীরবে পড়ে পড়ে মার খেত না। হয়তো আওয়ামী লীগই হিন্দু নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামত। যেমনটা আমরা ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেখেছি। শুনেছি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিজেপি নেতা শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর খালেদার প্রতি দৃঢ় আহবান, "হিন্দুদের উপর নির্যাতন বন্ধ করুন। যদি নিরাপত্তা দেওয়ার সামর্থ না থাকে তবে বলুন, দেড় কোটি হিন্দুকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা ভারতের আছে।"
৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সারা ভারত এমনকি সারা বিশ্বে হইচই পড়ে গিয়েছিল। হইচই এমনিতেই পড়েনি, শতশত ভারতীয় মুসলমান একটি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে দাঙ্গা লাগিয়ে, বিক্ষোভ করে জীবন বিসর্জন দিয়েছিল সেকালে। আর আমরা হাজার হাজার মন্দির আগুনে পুড়লে, মাটির প্রতিমাগুলো ধুলোয় মিশে গেলেও একবারের জন্য মুখ ফিরিয়ে দেখি না, যেন কিছুই হয়নি! ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হয়ে যা পারে বাংলাদেশী হিন্দুরা তা পারেনা কেন? দোষটা কাদের? বারাক ওবামা ভারত সফরে গিয়ে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার অভিযোগ তুলে ভারতকে খোঁচা দিলেন। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রনীতি দাদাগিরিতে বিশ্বাসী নয় তাইতো বাংলাদেশের উপর দাদাগিরি খাটানোর বহু সুযোগ থাকলেও ভারত তা বারংবার অবহেলা করেছে। মোদির বাংলাদেশ সফরের পূর্বেই RSS বাংলাদেশে চলমান হিন্দু নির্যাতনের ব্যাপারে মোদির হস্তক্ষেপ চেয়েছিল কিন্তু মোদি প্রকাশ্যে এই প্রসঙ্গে কিছু বলেননি। তবে গোপনে হাসিনার সঙ্গে আলাপ হতেও পারে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ জানানো না হলেও ভারতের নিশ্চয় কোনো কিছু অজানা নয়। নরেন্দ্র মোদির ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশী হিন্দুদের এই সামান্য চাওয়াটুকু অপরাধ ছিল না নিশ্চয়?
লিখেছেন
No comments:
Post a Comment