■••••••••••••
“বিবাহ” শব্দটি বি-পূর্বক বহ্ ধাতু ও ঘঞ্
প্রত্যয়যোগে গঠিত। বহ্ধাতুর অর্থ বহন
করা এবং “বি” উপসর্গের অর্থ
বিশেষরুপে। সুতরাং বিবাহ শব্দের
অর্থ বিষেশ রুপে বহন করা। বিবাহের
ফলে পুরুষ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং
মানসম্ভ্রমরক্ষার সার্বিক ভার বহন
করতে হয়।
●●বৈদিক দর্শন অনুযায়ী বিবাহ প্রধানত ১০ ধরনের-
১) ব্রহ্ম বিবাহঃ------- সবচেয়ে পবিত্র ও প্রসিদ্ধ বিবাহ। এই বিবাহে কন্যার পিতা সৎ, চরিত্রবান, বুদ্ধিমান, বিদ্বান পাত্রকে আমন্ত্রন জানান, সালঙ্কারা কন্যাদান ও দক্ষিনার মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
২) দৈব বিবাহঃ ------এই বিবাহ পদ্ধতিতে পিতা নিরালঙ্কারা কন্যাকে যজ্ঞের অগ্নির সম্মুখে কোন সাধুসন্ন্যাসীকেদান করে।যদিও এটি প্রশংসনীয়, কিন্তু এটি ব্রহ্ম বিবাহ অপেক্ষা নিম্ন।
৩)আর্য বিবাহঃ -------বিভিন্ন ধর্মীয় আচার রীতি ( যজ্ঞ) করার উদ্দেশে পিতা কন্যার বিবাহ দেন গাভি ও ষাঁড়ের বিনিময়ে।
৪) প্রজাপত্য বিবাহঃ যখন পাত্র, কন্যার পানিপ্রার্থি হয়, তখম কন্যার পিতা এই শর্তে বিবাহে সম্মতি দেন যে “ তোমরা সর্বদা ধর্ম, কর্ম ও কর্তব্যের পথে চলবে।“
৫) অসুর বিবাহঃ কন্যার পিতাকে পন/ যৌতুক প্রদান করে পাত্র যদি বিবাহ করে তাকে অসুর বিবাহ বলে।
৬) গন্ধর্ব বিবাহঃ কন্যা ও পাএ একে অপরকে চেনা জানা থাকলে তাদের সম্মতিতে বিবাহ কে গান্ধর্ব বিবাহ বলে।
নারী- পুরুষ পরস্পর শপথ করে মাল্যবিনিময়ের মাধ্যমে এই বিবাহ হয়। এর উদাহরণ, মহাভারতে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার বিবাহ গাদ্ধর্ব বিবাহ ছিল।
৭) রাক্ষস বিবাহঃ আত্মীয় পরিজন দের মারধর করে, ক্রন্দনরতা কন্যাকে জোরপুর্বক অপহরন করে যে বিবাহ করা হয়।
৮) পৈশাচ বিবাহঃ ঘুমন্ত, অচেতন, মানসিক ভাবে অসুস্থ কন্যাকে বিবাহ করলে।
৯) অনুলোম বিবাহঃ উচ্চবর্নের পুরুষ যদি নিম্নবর্নের নারী বিবাহ করে।
১০) প্রতিলোম বিবাহঃ নিম্নবর্নের পুরুষ যদি উচ্চবর্নের নারী বিবাহ করে।
৯ ও ১০ এর বংশধর অনুলোম প্রতিলোম প্রজাতি বিবেচিত হয়। প্রকৃত অর্থে ধর্ম অনুযায়ী অনুলোম প্রতিলোম বিবাহ স্বীকৃত নয়, যদিও সকল সন্তানই ভগবানের সৃষ্টি। শুক্রাচার্যের একনিষ্ঠ শিষ্য ছিলেন সূত। তার মা ছিল ক্ষত্রিয়, পিতা ব্রাহ্মন। সূত গীতা, পুরান সহ নানা গ্রন্থবিশারদ ছিলেন, কিন্তু নিজের অনুলোম জন্মহেতু নিজেকে শূদ্র বলে পরিচয় দিতেন।
♡বেদে বিবাহ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ-------
উদীর্স্বাতো বিশ্বাবাসো
নমসেলামহে ত্বা ।
অন্যামিচ্ছ প্রফর্ব্যং সং জায়াং পত্যা
সৃজ ।।১০/৮৫/২২।।
—অর্থাত্ তুমি যাও ও অবিবাহিত
নারীকে তোমার অর্ধাঙ্গিণী কর এবং
তাকে সমান অধিকার প্রদান কর।
আমাদের সনাতন বিবাহে কত গুলো
বিধিবিধান শাস্ত্রীয়, কিছু অনুষ্ঠান
আচার রয়েছে। শুভলগ্নে নারায়ণ, অগ্নি,
শিব, দূর্গা, গুরু ইত্যাদি দেবতাকে
আহবান করে এবং পুরোহিত আত্মীয়
স্বজনদের সাক্ষী করে মঙ্গল মন্ত্রের
উচ্চারণ, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে
বিবাহনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিয়ের
মন্ত্রের শেষ হয় যজ্ঞের মাধ্যমে।
■♡♡♡♡ বিবাহের মূল মন্ত্র যা স্বামী স্ত্রীরা
প্রতিজ্ঞা করে থাকে :
“যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম ।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ।।”
—তোমার এই হৃদয় আমার হোক আমার
এইহৃদয় তোমার হোক।
বিবাহের মাধ্যমে একজন নারীপুরুষ চীর
জীবন একসাথে সুখে দুঃখে থাকবার
প্রতিজ্ঞা করে।
বিবাহ আমাদের
সনাতন ধর্মের একটি অন্যতম অংশ।
প্রত্যেকেরই জীবনকে পরিপূর্ণ করতে
বিবাহ করা আবশ্যক।
■■■■■■বাঙালি হিন্দু বিবাহের লৌকিক আচার বহুবিধ।কিছু নিয়ম জানালাম-----------------
■ পাটিপত্র ••••••••পাটিপত্র বাঙালি হিন্দু বিবাহের প্রথম আচার। এই আচার লগ্নপত্র বা মঙ্গলাচরণ নামেও পরিচিত। ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে নগদ বা গহনাপত্রে যৌতুক ও অন্যান্য দেনাপাওনা চূড়ান্তভাবে স্থির করার জন্য যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই পাটিপত্র বলে। এই আচারের মাধ্যমেই বিবাহের অন্যান্য আচারের সূচনা ঘটে।
■ পানখিল•••••••••• পানখিল বাঙালি হিন্দু বিবাহের দ্বিতীয় আচার। এটি পাটিপত্রের ঠিক পরেই পালিত হয়। পানখিলের অর্থ পান পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খিল দেওয়া বা খড়কে বেঁধানো। এই আচারটি প্রথমে বরের বাড়িতে এবং পরে কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পানখিল আচারে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিনীরা বিয়ের গান গেয়ে থাকে। এই গানের বিষয়বস্তু হল রাম ও সীতার বিবাহ।
■ দধি মঙ্গল••••••••••••• দধি মঙ্গল বিবাহের দিন বর ও কন্যার উপবাস। তবে উপবাস নির্জলা নয়। জল মিষ্টি খাওয়ার বিধান আছে। তাই সারাদিনের জন্য সূর্য্যোদয়ের আগে বর ও কন্যাকে চিড়ে ও দৈ খাওয়ানো হয়।
■ গায়ে হলুদ•••••••• গায়ে হলুদ : সংস্কৃত ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় গাত্রহরিদ্রা। হিন্দু ধর্মে কয়েকটি জিনিসকে শুভ বলা হয়। যেমন শঙ্খধ্বনি, হলুদ ইত্যাদি। প্রথমে বরকে ও নিতবরকে সারা গায়ে হলুদ মাখানো হয়। পরে সেই হলুদ কন্যার বাড়ী পাঠানো হয়। কন্যাকে সেই হলুদ মাখানো হয়।
■ শঙ্খ কঙ্কন•••••••••••••••শঙ্খ কঙ্কন : কন্যাকে শাঁখা পরানো হয়। এরপর বিকালে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
■ বর বরণ••••••••••বরবরণ : বর বিবাহ করতে এলে তাকে স্বাগত জানান কন্যাপক্ষ। সাধাবনত: কন্যার মা তার জামাতাকে একটি থালায় প্রদীপ, ধান দুর্ব্ব ও অন্যান্য কিছু বরণ সামগ্রী নিয়ে বরণ করেন। এরপর বরকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় ও দুধ এবং মিষ্টি খাওয়ানো হয় ।
■ সাত পাক•••••••••••••• সাত পাক : বিবাহের মণ্ন্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিঁড়িতে বসিয়ে আনা হয়। সাধারণত: কন্যার জামাইবাবুরা পিঁড়ি ধরে থাকেন। কন্যা পান পাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন। কন্যাকে পিঁড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়।
■ শুভদৃষ্টি ••••••••••••শুভদৃষ্টি : বিবাহের মন্ডপে জনসমক্ষে বর ও কন্যা একে অপরের দিকে চেয়ে দেখন।
■ মালা বদল••••••••• মালা বদল : কন্যা ও বর মালাবদল করেন। এই রীতির অর্থ হচ্ছে দুজন একে অন্যকে জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিলেন। মুসলমান মতে একই ভাবে কন্যাকে বলতে হয় "কবুল"। আবার ঠিক এই রকমই খৃষ্টান মতে চার্চের ফাদারের সামনে বর ও কন্যা বিবাহে সন্মতি জানান।
■ সম্প্রদান••••••••••• সম্প্রদান: কন্যার পিতা কন্যাকে জামাতার হাতে সম্প্রদান করেন বেদমন্ত্রে। বরও জানান যে তিনি কন্যার ভরন পোষনের দ্বায়িত্ব নিলেন। বিবাহের মন্ত্র হল " যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।।"
ReplyDelete■ অঞ্জলি••••••••••••• অঞ্জলি : কন্যা ও বর খৈ অগ্নাহুতি দেন। প্রচলিত বাংলায় একে বলে খৈ পোড়া। বৈদিক যুগে মানুষ নানা ধরনের শক্তির উপাসনা করতেন। অগ্নিও তাদের মধ্যে অন্যতম।
■ সিঁদুর দান •••••••••••সিঁদুর দান : বিবাহের শেষ রীতি হল বর কন্যার কপালে সিঁদুর লেপন করেন। বাঙালি হিন্দু নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরেন।
(ডান দিকের ছবিটি অঙ্কন করেছেন এডমিন)
ॐ卐সত্যের জয় হোকॐ卐