অশোক ভারতের মৌর্য রাজবংশের তৃতীয় সম্রাট। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তার আদর্শ ছিল সত্যবাদী।
সম্রাট বিন্দুসার -এর ঔরসে রানি ধর্মা-র গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা বলা হয়ে থাকে। দেবতাপ্রিয় প্রিয়দর্শী ও ' ধর্মা' ছিল তার উপাধি।
অশোক তাঁর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য মৌর্য সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন ছিলেন ও সেনাবাহিনীর এক বড় অংশের পরিচালক ছিলেন। অশোকের এই শক্তিবৃদ্ধি বাকি ভাইদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে; সুসীম, বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র তার উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ইতোমধ্যে সুসীমের অপদার্থতায় তক্ষশীলা য় বিদ্রোহ দেখা দেয়। সুসীমেরই চক্রান্তে বিন্দুসার অশোককে সেখানে বিদ্রোহে দমনে পাঠান। অশোক আসার খবরে সেনাবাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, পরে বিদ্রোহী সেনারাও তাঁর আগমনে বিদ্রোহের পথ ত্যাগ করে ও বিনাযুদ্ধে অশোক বিদ্রোহ দমন করে ফেলেন।
যখন বিন্দুসারের অসুস্হতার খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন অশোক মগধের বাইরে ছিলেন। এরপর বিন্দুসারের পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের দখল নিয়ে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব শুরু হ্য়। অন্যান্য ভাইদের পরাজিত ও হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন।
তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দের দিকে সিংহাসন লাভ করেছিলেন।
রাজা হওয়ার পরই অশোক সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি পূর্বে বর্তমান আসাম ও বাংলাদেশ, পশ্চিমে ইরান ও আফগানিস্তান , উত্তরে পামীর গ্রন্থি থেকে প্রায় সমগ্র দক্ষিণ ভারত নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
খ্রীষ্টপূর্ব ২৬০-৬৩ অব্দের দিকে তিনি কলিঙ্গ রাজ্য জয় করেন। এই যুদ্ধে কলিঙ্গবাসী সর্বশক্তি দিয়ে অশোককের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও কলিঙ্গবাসী পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে এক লক্ষ নরনারী প্রাণ হারায় এবং প্রায় দেড়লক্ষ নরনারী বন্দী হয়। এই যুদ্ধের এই বীভৎসতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্থ করে তোলে। পরে তিনি যুদ্ধের পথত্যাগ অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনের নীতি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি অহিংসা নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর গুরু উপগুপ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু, লুম্বিনী, কুশীনগর, বুদ্ধগয়া- সহ নানা স্থানে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন। এই সময় তিনি নানা স্থানে স্তূপ, স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বাণী লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করেন। জনকল্যাণের জন্য তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জলকষ্ট দূরীকরণের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জলাশয় তৈরি করে দেন। অশোকের এই অহিংস নীতির কারণে, তাঁর সাথে প্রতিবেশী রাজ্য এবং গ্রিকদের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে।
অশোকলিপি অশোক নানারকমের বাণী পাহাড়ের গায়ে, পাথরের স্তম্ভে, পর্বতগুহায় লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করেন। যে সকল লিপিতে এই বাণী লেখা হয়েছিল, সে সকল লিপিকে সাধারণভাবে অশোকলিপি বলা হয়। এই সকল বাণী লেখা হয়েছিল ব্রাহ্মীলিপি ও খরোষ্ঠীলিপি তে।
এরপর অশোক দেশে ও বিদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হন। এই উদেশ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর প্রতিনিধিদের পাঠান। তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রা কে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে শ্রীলঙ্কা পাঠান। এছাড়া তিনি কাশ্মীর, গান্ধার , ভানাভাসী , কোংকন , মহারাষ্ট্র , ব্যাকট্রিয়া, নেপাল , থাইল্যান্ড , ব্রহ্মদেশ , লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি স্থানেও বৌদ্ধধর্ম প্রচার করান।
অশোকস্তম্ভ ও অশোকচক্র তার দুই অমর সৃষ্টি। বর্তমানে অশোকস্তম্ভকে ভারত প্রজতন্ত্রের জাতীয় প্রতীক করা হয়েছে। আর অশোকচক্র ভারতের জাতীয় পতাকার মধ্যে স্থাপিত হয়েছে।
সত্যমেব জয়তে।
ইতিহাসবীদ রোমিলা থাপারের মতে-অশোক যদি সত্যি ধর্মাশোক হতেন তবে কেন সেনাবাহিনীকে ভেঙ্গে দেন নি!
ReplyDeleteযুদ্ধের বন্দীদের কেন মুক্তি দেন নি! কলিঙ্গই তার প্রধান প্রতিপখ ছিল।তাই আর যুদ্ধের প্রয়োজন ছিলোনা।তিনি কেন যুদ্ধের পরে কলিঙ্গ ফিরিয়ে দেন নি।তাই তিনি কি প্রকৃত ধর্মাশোক।
কলিঙ্গ যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রেম করুণায় পূর্ণ হয়ে উঠল তার হৃদয়। চণ্ডাশোক অশোক রূপান্তরিত হলেন ধর্মাশোক অশোকে। অশোক ঘোষণা করলেন আর যুদ্ধ নয়, এবার হবে ধর্ম বিজয়। ভ্রাতৃত্ব প্রেম, করুণার মধ্যে দিয়ে অপরকে জয় করতে হবে। শুধুমাত্র নির্দেশ প্রদান করেই নিজের কর্তব্য শেষ করলেন না। এত দিন যে রাজসুখ বিলাস ব্যসনের সাথে পরিচিত ছিলেন তা পরিত্যাগ করে সরল পবিত্র জীবনযাত্রা অবলম্বন করলেন। তিনি সকল প্রতিবেশী দেশের রাজাদের কাছে দূত পাঠিয়ে ঘোষণা করেছিলেন তিনি তাদের সাথে মৈত্রী, প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান। সকলে যেন নির্ভয়ে আপন রাজ্য শাসন করেন। এমনকি সম্রাট অশোক তার উত্তরাধিকারীদেরকাছেও দেশ জয়ের জন্য যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি তাদের উপদেশ দিতেন অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, প্রেম করুণা সহৃদয়তার মধ্যে দিয়েই মানুষকে জয় কর। এই জয়কে সম্রাট অশোক বলতেন ধর্ম বিজয়।
ReplyDeleteকলিঙ্গ যুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে সম্রাট বিষণ্ন হয়ে গেলেন। অনুভব করলেন তার সমস্ত অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নিজের তাঁবুতে ফিরে দেখলেন শিবিরের সামনে দিয়ে চলেছে এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী।------- সন্ন্যাসী বললেন, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের সেবা করতে চলেছি।--------------------------- মুহূর্তে অনুতাপের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল সম্রাটের হৃদয়। সম্রাটের অন্তরে জ্বলে উঠল নতুন এক প্রজ্ঞার আলোক। তিনি শপথ করলেন আর যুদ্ধ নয়, আর হিংসা নয়, ভগবান বুদ্ধের করুণায় আলোয় অহিংসা মন্ত্রে ভরিয়ে দিতে হবে সমগ্র পৃথিবী।-------------------------- একদিন যিনি ছিলেন উন্মত্ত দানব- এবার হলেন শান্তি আর অহিংসার পূজারি প্রিয়দর্শী অশোক।
ReplyDeleteঅশোক কে ধর্মাশোক বলার ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের মতামত------------------------------------ ধর্মাশোক— ভারতবর্ষের একচ্ছত্র সম্রাট অশোক। ভ্রাতৃহত্যা প্রভৃতি নৃশংস কার্যের দ্বারা সিংহাসন লাভ করাতে ইনি পূর্বে চণ্ডাশোক নামে খ্যাত ছিলেন। কথিত আছে, সিংহাসনলাভের প্রায় নয় বংসর পরে, বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হইয়া তাঁহার স্বভাবের অদ্ভুত পরিবর্তন হয়—ভারত ও ভারতেতর দেশে বৌদ্ধধর্মের বহুল প্রচার তাঁহার দ্বারাই সাধিত হয়। ভারত, কাবুল, পারস্য ও পালেস্তাইন প্রভৃতি দেশে অদ্যাবধি আবিষ্কৃত স্তূপ, স্তম্ভ এবং পর্বতগাত্রে খোদিত শাসনাদি ঐ বিষয়ে ভূরি সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। এই প্রকার ধর্মানুরাগ এবং প্রজারঞ্জনের জন্যই ইনি পরে 'দেবানাং পিয়ো পিয়োদিশি' (দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শন) ধর্মাশোক বলিয়া প্রসিদ্ধ হন।----------------স্বামীজির বাণী ও রচনা-বর্তমান ভারত ।
ReplyDeleteঅশোক দেশে ও বিদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হন। এই উদেশ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর প্রতিনিধিদের পাঠান। তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রা কে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে শ্রীলঙ্কা পাঠান। এছাড়া তিনি কাশ্মীর, গান্ধার , ভানাভাসী , কোংকন , মহারাষ্ট্র , ব্যাকট্রিয়া, নেপাল , থাইল্যান্ড , ব্রহ্মদেশ , লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি স্থানেও বৌদ্ধধর্ম প্রচার করান। =============অশোক অন্যান্য সম্রাটদের থেকে কোথায় আলাদা ? ---**বৈদিক যুগ থেকে প্রচলিত-- সত্যের জয় সর্বত্র__ এই বানী আজীবন মেনে চলেছেন তিনি।যুদ্ধের বিভৎসতা দেখে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সরিয়ে আনেন যুদ্ধ থেকে।আপন করে নেন অহিংসা কে।শান্তির বানী প্রচার করেছেন। ইতিহাসে এমন বহু রাজা পাব যারা যুদ্ধ করেছেন।কিন্তু তিনিই হয়ত ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম রাজা যিনি একটা যুদ্ধের জন্য পুরো জীবনটাকে অহিংস আদর্শে নিয়োজিত করেছিলেন।এমন মহানুভাবী সম্রাট কে সবার থেকে আলাদা করাটাই স্বাভাবিক। তিনি হয়ত পারতেন আরও রাজ্য জয় করতে কিন্তু করেননি কারন কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তবন্যা তাঁকে একজন নীতিবান ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। ওই সময় থেকেই তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি ও ন্যায়নিষ্ঠ শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। জীবনের অবশিষ্ট সময় অহিংস ধম্মই তাঁর পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। ==================প্রজা দের তিনি কী চোখে দেখতেন ? ------** জনকল্যাণের জন্য তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জলকষ্ট দূরীকরণের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে জলাশয় তৈরি করে দেন। একজন সম্রাটের চোখে প্রজারা নিজ পুত্রের সমান,বাল্যকালে এই শিক্ষা গুরু চানক্যের কাছে শিখেছিলেন তিনি।তিনি ছিলেন প্রজাহিতৌষী শাসক। প্রেম করুণা সহৃদয়তার মধ্যে দিয়েই মানুষ এর মনকে জয় করেছিলেন তিনি।
ReplyDelete