ঝিলম করঞ্জাই মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পায় প্রাক-বৈদিক সভ্যতা, সম্রাট অশোক বা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে বাদ দিয়ে কি লেখা সম্ভব ভারতবর্ষের ইতিহাস? গুপ্তযুগ, কুষাণ যুগকে বাদ দিয়ে সুলতানি আমলের প্রতিষ্ঠা থেকেই কি সূচনা হতে পারে কোনও ইতিহাস বই? উত্তর জানতে খুব শিগগিরই আদালতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ৷ তাদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের নবম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে প্রাচীন যুগকে বাদ দিয়ে, সরাসরি ইসলামি যুগ থেকেই শুরু হচ্ছে পঠনপাঠন৷ সঙ্ঘের মত, ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে মাদ্রাসাবোর্ডের সিলেবাসে৷ ভারতীয় সভ্যতার বিকাশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মাদ্রাসার পড়ুয়াদের৷ এই অভিযোগে আগামী সন্তাহেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করতে চলেছে সঙ্ঘের একটি সহযোগী সংগঠন৷ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই আরএসএস-এর নানা কর্মসূচি ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে৷ শিক্ষাক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন অমর্ত্য সেনের মতো শিক্ষাবিদ৷ সঙ্ঘ পরিবারের ঘর ওয়াপসি কর্মসূচি উদ্বেগ বাড়িয়েছে সংখ্যালঘুদের৷ পুনের এফটিআইআইয়ের সঙ্ঘ পরিবারের পছন্দের গজেন্দ্র চৌহানকে চেয়ারম্যান করায় ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়লেও অনড় বিজেপি সরকার৷ এর মধ্যেই মাদ্রাসা বোর্ডের সিলেবাস নিয়ে সঙ্ঘ পরিবারের এই সিদ্ধান্তে প্রশ্ন জেগেছে নানা মহলে৷ সঙ্ঘের বক্তব্য, যে ইতিহাস দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়ানো হচ্ছে তা খণ্ডিত৷ এর পরিবর্তন দরকার৷ এই লক্ষ্যে শুধু মাদ্রাসার সিলেবাস পর্যালোচনা নয়, সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতির মানদণ্ড নিয়েও সরব হয়েছে তারা৷ তাদের দাবি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পরিচালনাধীন হলেই কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই স্বীকৃতি দেওয়ার চলতি সাংবিধানিক বিধানের পরিবর্তন দরকার৷ তাদের বক্তব্য, যে প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের সিংহভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সেগুলিরই শুধুমাত্র এই স্বীকৃতি পাওয়া উচিত৷ এই দাবি নিয়ে আগামী মাসেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে চলেছে আরএসএস-এর সহযোগী সংগঠন ভারতীয় শিক্ষণমণ্ডলী৷ মাদ্রাসার ইতিহাসের সিলেবাস নিয়ে কোন সংগঠন কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবে তা এখনও স্থির হয়নি৷ শুক্রবার আরএসএস-এর দক্ষিণবঙ্গের কার্যবহ জিষ্ণু বসু বলেন, 'মাদ্রাসায় যে ভাবে খণ্ডিত ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে তা বিপজ্জনক৷ আমার মনে হয় দায়িত্বশীল নাগরিকদের উচিত আদালতের কাছে এ নিয়ে সুবিচার প্রার্থনা করা৷' সংবিধানের ৩০, ৩১ এ, ৩১ বি ও ৩১ সি ধারায় সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকার এবং সেগুলি কী ভাবে পরিচালিত হবে তা উল্লেখ রয়েছে৷ জিষ্ণু প্রশ্ন তুলেছেন যে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির জোরে কি বিকৃত ইতিহাস পড়ানো যায়? তবে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা পর্ষদের সচিব সৈয়দ নুরুস সালাম বলেন, 'পঞ্চম শ্রেণি থেকেই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পড়ানো হয়৷ নবম-দশম শ্রেণিতে এই কারণে সমস্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি৷ পুরো সিলেবাস প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ দিতে গঠিত এক্সপার্ট কমিটি প্রস্তুত করেছেন৷ কারও মতামত থাকলে আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত৷ সে ক্ষেত্রে ফের এক্সপার্ট কমিটির সুপারিশ চাওয়া হবে৷' সঙ্ঘের এই সিদ্ধান্তে রাজ্যে শিক্ষাবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে৷ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সজ্জত আলম রিজভি বলেন, 'যে কোনও বিষয়কেই বস্তুনিষ্ঠ ভাবে পড়ানো উচিত৷ তবে ইতিহাসকে দেখার নানা আঙ্গিক রয়েছে৷ আরএসএস এক রকম ভাবে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করে৷ আবার উত্তর আধুনিক ঐতিহাসিকরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে৷ এ ক্ষেত্রে কোনও বিতর্ক হয়ে থাকলে সিলেবাস পুনর্বিন্যাস করার দরকার রয়েছে কি না সেটা ভেবে দেখা উচিত৷' রিজভির কথায়, তিনি উত্তরপ্রদেশের এক মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন৷ সেখানে ভারতে সুলতানি যুগের আগে কী ছিল সেটা একেবারে ছাত্রাবস্থা থেকেই পড়ানো হয়েছিল৷ ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায় বলেন, 'মাদ্রাসা বোর্ডের নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে৷ তাতে কারও হস্তক্ষেপ করার কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই৷ আরএসএসের এক্তিয়ারে এটা পড়ে না৷ ওখানকার বেশিরভাগ পড়ুয়ারাই তো মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত৷ তাই তাদের কথা ভেবে যদি ইসলামি ইতিহাস বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে, তাতে আপত্তি উঠবে কেন?' শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার এ নিয়ে মতামত দিতে গিয়ে বলেন, 'ধর্ম আর দেশ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়৷ যদি সত্যিই এ রকম সিলেবাস করা হয়ে থাকে তা হলে বলব এটা ধর্মের কথা ভেবেই করা হয়েছে৷ আবার এর উল্টোদিকে যারা বিরোধিতা করছে, তারাও কিন্তু ধর্মের কারণেই করছে৷ যে দেশে বহু ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন সেখানে ইতিহাসকে সামগ্রিকতার বিচারেই দেখতে হবে৷ আমি কোনও পক্ষকেই সমর্থন করছি না৷' অধ্যাপক-বিধায়ক তরুণ নস্করের বক্তব্য, 'আরএসএস-এর হাতে যদি দেশের ইতিহাস লেখার দায়িত্ব যায়, তা হলে দেখা যাবে ওরা আর্য যুগের মধ্যেই ইতিহাসকে আটকে রাখবে৷ কারণ ওরা মনে করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-অর্থনীতি-সহ সব কিছু ঘুরপাক খায় কেবল ওই আর্যদের সময়েই৷ কিন্তু ইতিহাসকে সার্বিকভাবেই দেখা উচিত৷'
No comments:
Post a Comment