Thursday, 9 July 2015

পবিত্র বেদের রচনাকাল

পবিত্র বেদের রচনাকাল ঠিক কতো এ ব্যাপারে অনেকে অনেক ধরনের মত দেন। কেউ বলেন বেদ অনন্তকাল ধরে আছে,কেউ বলেন কয়েক লক্ষ,কেউ বা বলেন দশ হাজার। কিন্তু দুঃখের কথা হলো পাঠ্য পুস্তকসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতামত ঋগ্বেদের রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-১২০০ অব্দ। এই তারিখটাই বর্তমানে সার্বজনীনভাবে গৃহীত। সমস্যা হলো,এই তারিখের পেছনে যে গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে তা অনেকেই জানেন না। 'আর্য আগমন তত্ত্বে'র সাথে এই তারিখের গভীর সম্পর্ক আছে। এ তত্ত্ব মতে আমাদের পূর্ব পুরুষ আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আবার আরেক মত বলে আর্যরা ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে এসে দ্রাবিড়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এখানে বসতি স্থাপন করেন। তত্ত্বদাতা আর গবেষকরা কনফিউশনে আছেন। যাই হোক,এই তত্ত্বের কারণে আর্যদেরকে বিভিন্ন জায়গায় বহিরাগত উপাধি দেওয়া হয়। কিন্তু 'আর্য আগমন তত্ত্ব' বা আর্যদের বহিরাগত বলা আর বেদের এই তারিখ দেওয়াটা যে কতো বড়ো ষড়যন্ত্র,মিথ্যাকল্পনা তা বিজ্ঞান আর গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে। কিছু উদাহরণ:- প্রথমত,জেনেটিক রিসার্চ। ২০০৯-২০১১ সালে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা ভারত জুড়ে ৩ বছরব্যাপী একটি গবেষণা করেন। ভারতের বিভিন্ন জায়গার মানুষের ডিএনএ নিয়ে পরীক্ষা করেন তাঁরা। ভারত দলের অন্যতম সদস্য ডঃ জ্ঞানেশ্বর চৌবে বলেন,'আমরা প্রমাণ করেছি যে সমগ্র ভারতবাসীর জিন একই বৈশিষ্ট্য এবং একই উৎস সম্পন্ন। গত ৬০০০০ বছর ধরে ভারতের মূল স্রোতে কোনো বিদেশী জিন প্রবেশ করেনি। 'আর্য আগমন তত্ত্ব মতে আর্যরা খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের মধ্যে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেন যা ডঃ চৌবের কথায় ও তাদের গবেষণায় সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। এতে বোঝা যায় আর্যরা শুরু থেকেই ভারতবর্ষে আছেন এবং বেদের রচনাকাল অনেক আগেই। দ্বিতীয়ত,পবিত্রবেদে এমন কোনো মন্ত্র নেই,যেখানে বলা হয়েছে আর্যরা বিদেশ থেকে এসেছেন। বরং বৈদিক ঋষিদের ভারতবর্ষের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে এবং এটা বোঝা যায় যে,আর্যরা আদি থেকেই এখানে আছেন। তৃতীয়ত,বেদের প্রাচীনত্ব এবং আর্যদের আদিবাসী হওয়ার আরেকটা প্রমাণ হল সরস্বতী নদী। বেদে অনেকবার সরস্বতীকে দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এটা বোঝা যায় যে বেদ রচনার সময় সরস্বতী পূর্ণ নদী ছিল অর্থাৎ শুকানো বা এ জাতীয় কোনো লক্ষণ ছিলনা। স্যাটেলাইট দিয়ে প্রাচীন মৃত সরস্বতী নদীর গতিপথ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং জানা গেছে যে,সরস্বতী নদী খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে শুকানো হতে শুরু করে এবং খ্রিষ্টপূর্ব ১৯০০ অব্দে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। এখন এটা প্রমাণ করে যে বেদ পরবর্তী যেসব গ্রন্থে সরস্বতী নদীর কথা বলা হয়েছে,সেই সব গ্রন্থ খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের আগে রচিত। তাহলে বেদ অবশ্যই আরো অনেক আগে রচিত এবং আর্যরা অবশ্যই আগে থেকেই ভারতবর্ষে ছিলেন। চতুর্থত,খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০ অব্দের পুরনো শহর মেহেড়গড়,এতে প্রত্নতাত্ত্বিকগবেষণায় যেসব নির্মানাদি পাওয়া গেছে,দেখা গেছে যে সেগুলো বৈদিক স্থাপত্য বিধি অনুযায়ী রচিত। এটা প্রমাণ করে এ শহরের আগেও মানুষ বৈদিক রীতি মেনে চলতো। পঞ্চমত,নক্ষত্রের অবস্থান। এক বৈদিক ব্রাহ্মণ গ্রন্থে নক্ষত্রের এমন এক অবস্থানের কথা বলা হয়েছে যার সময় হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০০ অব্দ। আবার তৈত্তিরীয় সংহিতায় নক্ষত্রের এমন এক অবস্থানের কথা বলা হয়েছে যার সময় হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৮৫০০ অব্দ। এই গ্রন্থগুলো যেহেতু ঋগ্বেদ সংহিতা পরবর্তীতে রচিত,সেহেতু ঋগ্বেদ সংহিতার রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৮৫০০ এর অনেক আগে। আরো অনেক ছোট বড়ো গবেষণা প্রমাণ করে যে বেদ অনেক প্রাচীন আর আর্যরা ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসী। এখন কথা ওঠে আর্য আগমন তত্ত্বের বিরুদ্ধে এতো প্রমাণ দ্বারা এটি ফাউল প্রমাণিত হওয়ার পরেও কেন জ্ঞানীগুণীরা এ তত্ত্ব দিলেন? কেন এ তত্ত্ব বেশি প্রচলিত?- প্রথমত,ইংরেজদেরশাসন-শোষণের একটা কৌশল ছিল 'divide and rule'.তারা উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য আর্য আর দ্রাবিড় আলাদা জাতি-এ তত্ত্বের সূচনা করে। আর্য আগমন তত্ত্ব দিয়ে তারা মানুষকে বোঝাতে চায় যে,দ্রাবিড় আদিম অধিবাসী আর আর্যরা বিদেশী আক্রমণকারী। এক্ষেত্রে মেকলেসহ অনেকে আর্য আগমন তত্ত্ব দেওয়ার জন্য ইংরেজ পন্ডিতদের সাথে ষড়যন্ত্র করেন। দ্বিতীয়ত,এ তত্ত্বের মূল হোতা ম্যাক্সমূলার অবৈজ্ঞানিক ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন যেখানে বলা হয়েছে মানুষের সৃষ্টি খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে আর মহাপ্লাবন হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের পর। এ অনুযায়ী তিনি তত্ত্ব দেন যে,খ্রিষ্টপূর্ব১৫০০ অব্দে আর্যরা বাইরে থেকে এখানে আসেন। এর পিছনে কোনো প্রমাণ নেই। এটা ষড়যন্ত্রের অংশ। দুঃখের বিষয় হলো,আর্য আগমন তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরেও বর্তমানে স্কুল কলেজে পড়ানো হয় যে,আর্যরা বহিরাগত। আর্য শব্দে কোনো জাতি বোঝায় না। আর্য বলতে বোঝায় সম্মানিত,জ্ঞানীব্যক্তি। আমাদের সবার আর্য হয়ে ওঠা উচিত। —

No comments:

Post a Comment