এক অকুতোভয় অনন্যসাধারন বামপন্থী কথাশিল্পী 'হুমায়ূন আজাদ' ও তার অমর কালজয়ী সৃষ্টিঃ
পাক সার জমিন সাদ বাদ
[হুমায়ন আজাদ]
পর্ব ৮
‘ সোভানাল্লা , এক কালের কমিউনিস্টরাও আমাগো লগে জয়েন করছে, হেরা অহন পাক স্তান আর ইছলাম ছাড়া আর কিছুই বোঝে না, আলহামিদুদিল্লা,গত কয় মাসে আমি দশগন্ডা কমিউনিস্টরে তোবা পড়াইছি। কমিউনিস্টরাও জেহাদে বিশ্বাস করতো, শ্রেনীসংগ্রামেরজেহাদ, ক্যালাশস্ট্রাগলের জিহাদ, এইখনে তারা নিজগো ভুল বুজতে পারছে, খাডি জিহাদে ফিইর্যা আইছে। দ্যাখ নাই, ১৯৭১এ একদল কমিউনিস্ট আমাগো লগে কাম করেছে, সোভানাল্লা। ’
আমি একসময় মার্ক্সবাদ করেছি, সাম্যবাদী ইশতেহার পড়েছি, বস্তুবাদ ছাড়া আর কিছুই বুঝিনি, সব কিছুর ব্যাখ্যা করেছি মার্ক্স-এঙ্গেলসের বস্তুবাদী ভাষায়, হেগেলকেও টেনে এনেছি; বলেছি, কমিউনিস্ট ইশতেহার হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বই, শ্রেষ্ঠ ঘোষনা, নেতাদের সাথে স্লোগান দিয়েছি পথে পথে, কিছু পাই নি; আমাদের নেতারা রাশিয়ার ভোদকা আর চীনের বিড়ি পেত, আমি তাও পাইনি; আলহজ এরশাদের সময় মার নেতারা যখন তার পা চাঁটতে শুরু করে, মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হতে শুরু করে, আমার ঘেন্না লাগে; তখন আমি সর্বহারা দলে যোগ দিই, এখানে সেখানে দু একটি খুন করি, ডাকাতি করি- করতে ভালোই লাগে, দু-একটি মেয়েকে ধর্ষন করি, আমি ঠিক ধর্ষনের মত করিনি, তাদের আমি রাজি করাই,প্রথমে ছেড়ে দেই, তারপর তাদের সাথে আমার কয়েকবার দৈহিক সম্পর্ক হয়, আমি ঠিক মত পেরে উঠিনি , তারা সবাই বলে , ‘তুমি পার না’ , আমি তখন পারতাম না, এখন পারি, ধীরেসুস্থে পারতে শিখেছি; তারপর আমি যোগ দিই ‘জামাঈ জিহাদে ইছলাম পার্টিতে’। আমি মুক্তির পথ খুজে পাই, জীবন পাই।
জামাঈ জিহাদে ইছলাম পার্টি আমাকে উদ্দীপ্ত করে, আমি প্রচন্ড উত্তেজনা বোধ করি, এই উত্তেজনা দেহের বিশেষাঙ্গের উত্তেজিনার থেকে অনেক বেশি তীব্র; আমি দেখতে পাই আমি বেঁচে উঠছি, আমি বেহেশতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঊঠি। মাওলানা মওদুদু, ইমাম গজ্জালি, আয়াতুল্লা খোমেনির বই আর কোরান-হাদিছ পড়ে আমি বুঝতে পারি এতকাল আমি ভুল পথে ছিলাম, দোজগের রাস্তায় ছিলাম, এখন আমি ঠিক পথে এসেছি; এখানে সব সময়ই সোয়াব, সবসময়ই উত্তেজনা; পৃথিবীতে মুছলমান আর ইছলাম ছাড়া আর কিছু থাকবে না, এ-বিশ্বাস আমাকে মাতাল করে তোলে—নাউজুবিল্লা, ‘মাতাল’ শব্দটি ঠিক হয়নি, আল্লা আমাকে ,আফ করবেন; এ-সময়ই আমি চমৎকার জীবন পাই। যখন মার্ক্সবাদী ছিলাম, যখন সর্বহারা ছিলাম, তখন আমার কোনো জীবন ছিল না; জামাঈ জিহাদে পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর আমি প্রায় সব পাই, বেহেশত তো পাবই। যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আমি জামাঈ জিহাদে ইছলামের ‘মদিনাতুন্নবি’ অঞ্চলের নেতা হয়ে উঠি, আমায় খুব চেষ্টা করতে হয় না; আমার প্রধান নেতারা বুঝতে পারেন যে-তিরিশটি মাদ্রাছার তালেব এলেম নিয়ে এই অঞ্চলের সংঘটি সংগঠিত, ওই সব হাফেজিয়া ফোরকানিয়া কওমি কামিল দাখিল সাধারন মাদ্রাছার তালেবানদের মাথায় ঘিলু এই, যেমন তাদের মাথাও নাই, তাদের মগজ অন্য জায়গায়; তাই যোগ দেওয়ার কয়েক মাসে মধ্যেই আমি নেতা হয়ে উঠি।
নেতা হওয়ার মত সুখ ও স্বাদ ও কাম আর নেই।
শুধু ক্ষমতা নয়, ক্ষমতার মধ্যে যা শ্রেষ্ঠ-টাকা, তা আমার হাতে আসতে শুরু করে অঢেল, টাকা যে পানির স্রোতের মত নানা খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়, তা আমি আগে জানতাম না, এখানে এসে দেখি নানা খাল দিয়ে ঢৈউ তুলে টাকা আসছে আমার দিকে। ক্ষমতা ও টাকা মানুষকে মহাপুরুষে পরিনত করে, অমরতা দেয়। মার্ক্সবাদে আমার পকেটে একটা আধুলিও আসত না, সর্বহারা ডাকাতির সময় আসত দু-তিন হাজার টাকা, কিন্তু তখন সবসময় বিপদের ভয় থাকত, এখন কোনো ভয় নেই; এখানে নেতা হওয়ার পর আমার হাতে আসতে থাকে লাখ লাখ টাকা। টাকা যে কত সুন্দর, রূপসী, শাশ্বতী টা আমি বুঝতে পারি নেতা হওয়ার পর থেকে; অস্ত্র কেনার পর,ইছলামের সিপাহীদের টাকা দেওয়ার পর, আমার বাক্সে পরে থাকতে শুরু করে লাখ টাকা। আল্লা আর পাক স্তান ছাড়া এত টাকা আর আমাকে কে দিতে পারত? —
No comments:
Post a Comment